শিরোনাম
প্রচ্ছদ / মালয়েশিয়া / দীর্ঘ ৯ মাস মালয়েশিয়ার জঙ্গলে কাটানোর পর আকাশ দেখেন সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে মালয়েশিয়া আসা প্রবাসী মিনারুল!

দীর্ঘ ৯ মাস মালয়েশিয়ার জঙ্গলে কাটানোর পর আকাশ দেখেন সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে মালয়েশিয়া আসা প্রবাসী মিনারুল!

বিশাল জঙ্গল আর পাহাড়, সেখানে হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে থাকতাম। পলিথিনের বেড়া দিয়ে শীত, বৃষ্টিতে জঙ্গলের ভেতর পশুর মতো থাকতি হতো, সে কী কষ্ট! মানুষ ভাবে মালয়েশিয়াতে অনেক ভালো আছি। কেমনে আছি, সেটা আমরাই জানি, বলছিলেন ৪৪ বছরের মিনারুল ইসলাম।

নয় মাস পরে কুচং পুত্রাহেক এলাকার সেই জঙ্গল থেকে মুক্ত আকাশের নিচে আসি বলে জানান মিনারুল। জঙ্গলে থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘জঙ্গল থেকে মূল রাস্তায় বের হবার পর নিজের শরীরে নিজে চিমটি দিয়ে দেখছি, তখনও বেঁচে ছিলাম কি না, বলতে বলতে আবেগ প্রবণ হয়ে যান তিনি। মালয়েশিয়ার মসজিদ ইন্ডিয়া নামক স্থানে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কথা হচ্ছিল মিনারুলের সঙ্গে।

সেই রাতের বেলায় রাস্তায় জ্বলতে থাকা হলুদ আর সাদা বৈদ্যুতিক বাতিতে মিনারুলের চোখের কোনে চিকচিক করা পানি গড়িয়ে পড়ে।

মিনারুল জানান, আড়াই বছর আগে সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে মালয়েশিয়ায় আসেন, এখনও টাকা ওঠেনি। যেদিন থেকে আইছি তারপর দিন থেকেই অবৈধ। মালয়েশিয়াতে আসার পর থেকে দালাল দেখা করেনি, খোঁজও নেয়নি, ফেরত দেয়নি পাসপোর্ট। এখানে লুকিয়ে লুকিয়ে কাজ করতে হয়, থাকতে হয় ভয়ে ভয়ে।

কেবল মিনারুল নয়, তার সঙ্গে থাকা তারিক, শাকিল, মামুনসহ বাংলাদেশিরা জানালেন, তারা দালালের মাধ্যমে মায়য়েশিয়াতে এসেছিলেন একটু সুখের আশায়, সংসারে স্বাচ্ছন্দ্যের আশায়। কিন্তু তারা প্রতারিত হয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে এজেন্সিগুলো ভালো ভালো কথা বলে আনলেও মালয়েশিয়াতে আসার পর পুরো বিপরীত চিত্র দেখছেন। অথচ তাদেরকে দিয়ে গাধার খাটুনি খাটানো হচ্ছে। যে কথা তারা নিজের পরিবারকেও বলতে পারছেন না তাদের কষ্ট হবে চিন্তা করে।

মিনারুল ইসলামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থানার কুমারী ইউনিয়েনের পাটদূর্গাপুর গ্রামে। তাদের গ্রামেরই খায়রুল নামের এক দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়াতে আসেন। কিন্তু বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই ভোগান্তি শুরু হয় তার।

মিনারুল বলেন, বিমানবন্দরে নামার পর দালাল খায়রুলের বোনজামাই নওশেদ পাসপোর্ট নিয়ে যায় কাজের কথা বলে।

কিন্তু সেই যে পাসপোর্ট নিয়ে গেল আর ফেরত পাইনি। তার তিনদিনের মাথায় পুলিশ ধরে। কিন্তু ছাড়লো না, টাকা চাইলো। আমার কাছে ৩০০ রিঙ্গিত ছিল। দিয়ে দিলাম, খাওয়ার টাকা ছিল না সে সময়। ‘১৫ দিন না খায়ে ছিলাম, কেউ খাতি দিলি খাইতাম, না দিলি না খায়ে থাকতাম। আমি দেশে ফোন করি, এরা খাতিও দেয় না, কাজও দেয় না। কাজ চাইতি গেলি মারধোর করে’।

তারপর পুলিশের ভয়ে আরও অনেকেসহ সেই জঙ্গলে গেলাম। হাজার হাজার মানুষ ওপরে সেখানে একসঙ্গে জঙ্গলে থাকতাম। মিনারুল বলে চলেন, ‘বিশাল জঙ্গল, বিশাল পাহাড়-তার ভেতরে কোনো জীবন ছিল না। পলিথিনের বেড়া দিয়ে থাকতাম-বৃষ্টি, শীত, জঙ্গলের ভেতরে পশু- এর মধ্যে থাকতি হতো। সে কী কষ্ট! মানুষ ভাবে, মালয়েশিয়াতে অনেক ভালো আছি। কিন্তু কেমনে যে আছি, সেইটা আমরাই জানি।

বাবা-মা-বউ আর তিনটা বাচ্চা আছে। কতদিন হয়ে গেল তাদের দেখি না। দেখতে কতো ইচ্ছে করে, কিন্তু কাগজপাতি নেই, কিছু নেই। দেশেতো যাইতে পারি না, বলতে বলতে কেঁদে দেন মিনারুল। বলেন, পাসপোর্ট ফেরত পাব কি না, কবে পাব তাও জানি না। মরণটাও বোধহয় এই দেশে এভাবেই হবে, চোখ মোছেন তিনি। বলেন, পাসপোর্ট পাবার আশায় মামুন নামের এক বাংলাদেশিকে ৮ হাজার রিঙ্গিত দিয়েছি, আজও পাসপোর্ট পাইনি।

মিনারুলের সঙ্গেই ছিলেন চুয়াডাঙ্গার রোয়াকুল গ্রামের তারিক হোসেন। পাঁচ বছর আগে সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে ভাগ্য বদলাতে এসেছিলেন এখানে।

কিন্তু এখনও বৈধ হতে পারেননি। অবৈধদের গ্রেফতারে যখন পুলিশ অভিযান চালায় তখন পালিয়ে থাকতে হয়। মসজিদ ইন্ডিয়া এলাকাতে একটি বহুতল ভবন তৈরির কাজে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন দুনই। তাদের বেতন দুই হাজার রিঙ্গিত। থাকা খাওয়া মিলিয়ে ৪০০ থেকে সাড়ে চারশো চলে যায়। বাকিটা বাড়ি পাঠাতে পারেন।

মিনারুল আর তারিক হোসেন পুলিশের ভয় কাটিয়ে বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারলেও এখনও ঋণের টাকাই শোধ করতে পারেননি মামুন আর শাকিল। তারা কাজ করছেন জেনটিং হাইল্যান্ডের একটি ফুডকোর্টে। সেখানেই কথা হয় মামুন আলি আর শাকিলের সঙ্গে।

দুজনের বাড়ি বগুড়াতে। মামুন এখানে এসেছেন এক বছর হলো, বাবা কৃষিকাজ করেন। তাই কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য আনতে মালয়েশিয়াতে আসেন তিনি। কৃষি ব্যাংক থেকে দুই লাখ, বোন জামাই আর চাচাতো ভাইদের কাছ থেকে সুদে লোন করে এই দেশে এসেছেন তিনি।

তিনি যখন এখানে আসেন তাকে বলা হয়েছিল আট ঘণ্টা কাজ করতে হবে, কিন্তু এখন কাজ করতে হয় ১২-১৪ ঘণ্টা, কোনো ওভারটাইম নেই।

১ হাজার ২০০ রিঙ্গিত বেতন অথচ বেতন ছিল আরও বেশি। মামুন বলেন, ‘আমরা খুব কষ্টের ভেতরে আছি। বহুত কষ্টেতে আছে বাংলাদেশিরা। ‘খুব কষ্টের ভেতরে আছি, ১২শ টাকার ভেতরে নিজে কি খাবো আর দেশেই বা কি পাঠাবো’।

এই এক বছরে মাত্র ৭০ হাজার টাকা দেশে পাঠাতে পেরেছেন মামুন আলী। এসটিএস কোম্পানির মাধ্যমে এসেছিলেন দুজনই। বলেন, সকাল দশটা থেকে রাত সাড়ে দশটা কখনো কখনো সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। কষ্ট হয় বলে বাংলাদেশি অ্যাজেন্টকে ফোন করেছেন, কষ্টের কথা বলেছেন, কিন্তু তারা বলেছে, ‘এসব কথা বলে কোনো কাজ হয়নি আর হবেও না’।

এসটিএস কোম্পানির মাধ্যমেই ৪ লাখ টাকায় দেড় বছর আগে মালয়েশিয়াতে আসেন শাকিল। বাবার জমিন আর গরু বেইচা আসছিলাম, কিন্তু এখানে আইয়া কোনো লাভ হইলো না। বরং, দেশে থাকলে সবাইরে দেখতে পাইতাম, এখনতো তাও পারি না। কেবল আমরা না, পুরো মালয়েশিয়াতে আমাদের মতো লাখ লাখ বাংলাদেশি রয়েছে-যারা একবেলা ঠিকমতো খেতে পায় না, একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। এই কষ্টের কোনো শেষ নেই-খাবারের ট্রে থেকে খাবার নামাতে নামাতে বলেন শাকিল, কণ্ঠটা ভারি হয়ে আসে তার।

প্রবাসীদের সকল ভিডিও খবর ইউটিউবে দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটি: