শিরোনাম
প্রচ্ছদ / মালয়েশিয়া / দেউলিয়াত্বের পথে মালয়েশিয়া, যে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন মাহাথির!

দেউলিয়াত্বের পথে মালয়েশিয়া, যে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন মাহাথির!

একের পর এক ব্যয়বহুল মেগা প্রজেক্ট। উপরি হিসেবে রয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি। অর্থনীতিতে কালো টাকার ছড়াছড়িও অনেক। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংক নোট বাতিলের কথাও বলছেন অনেকে। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি রিঙ্গিতে (২৭ হাজার ৪০০ কোটি ডলার), যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৮০ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেউলিয়াত্বের পথে মালয়েশিয়া। এ অবস্থায় ৯২ বছর বয়সে অবসর ভেঙে ফিরে এসে নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ার হাল ধরলেন মাহাথির মোহাম্মদ।

মালয়েশিয়া যে দেউলিয়াত্বের পথে, সেটা অস্বীকার করে নানা প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখছেন অনেকে। যদিও দেশটির নতুন সরকারের কার্যক্রমে উল্টো ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে। আসন্ন দেউলিয়াত্বকে ঠেকাতে রীতিমতো মরিয়া হয়ে উঠেছেন মালয়েশিয়ার নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। এজন্য সোমবার এফটিকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে কুয়ালালামপুর থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত নির্মিতব্য একটি হাইস্পিড রেলওয়ে প্রকল্প বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ঘোষণা দিয়েছেন পূর্বসূরি নাজিব রাজাকের আমলে নেয়া সব মেগা প্রকল্প পুনরায় যাচাইয়ের।

সাক্ষাত্কারে ‘অপ্রয়োজনীয়’ সব অবকাঠামো প্রকল্প বাতিলের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন মালয়েশিয়ার নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ব্যয় সংকোচনের পদক্ষেপ হিসেবে কয়েক হাজার সরকারি কর্মচারীকেও চাকরিচ্যুত করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। নিজ দেশকে ‘দেউলিয়া হিসেবে ঘোষণা করার পথ রুদ্ধ করতেই’ এত বড় পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, ‘এ মুহূর্তে যেসব বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তার মধ্যে অন্যতম হলো মালয়েশিয়ার আর্থিক পরিস্থিতি।’

মাহাথির মোহাম্মদ বর্তমানে মালয়েশিয়ার দেনা কমানোয় প্রাণান্তকর প্রয়াস চালিয়ে গেলেও, পরিস্থিতিকে আরো প্রতিকূলে নিয়ে যেতে পারে তার সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত। মালয়েশিয়ার জনগণ মহাসড়কে যান চলাচলে টোল হ্রাস, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দান এবং গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স (জিএসটি) বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিলেন অনেক দিন ধরেই। এতে সায় দিয়ে এসব দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মাহাথির মোহাম্মদ। এতে মালয়েশিয়া সরকারের বার্ষিক রাজস্ব কমবে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ, যা দেশটির এ বছরের মোট রাজস্ব আয়ের এক-পঞ্চমাংশ।

তবে এ প্রসঙ্গে মাহাথিরের বক্তব্য হলো, ‘গণতন্ত্র মানেই পরিবর্তন ও সার্বক্ষণিক চাপ। কখনো কখনো আমাদের সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের বদলে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণের দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে হয়।’

সিভিল সার্ভিসে ব্যাপক পরিবর্তনের যে পদক্ষেপ মাহাথির মোহাম্মদ নিতে যাচ্ছেন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পথকে তা আরো অমসৃণ করে তুলতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া ১৭ হাজার সরকারি কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হবে বলে জানিয়েছেন মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, সরকারযন্ত্র এখন পুরোপুরি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং আমাদের এখন এ দুর্নীতিগ্রস্ত যন্ত্রের ওপরই নির্ভর করতে হবে। কারণ আমাদের পক্ষে এখন সবাইকে তাড়ানো সম্ভব নয়।’

কুয়ালালামপুর-সিঙ্গাপুর হাইস্পিড রেলওয়ে নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষর হয় ২০১৬ সালে। ৩৭০ কিলোমিটার (২১৭ মাইল) দীর্ঘ রেলপথটির নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য অনুমিত সময় ধরা হয়েছিল ২০২৬ সাল পর্যন্ত।

সিঙ্গাপুর ও কুয়ালালামপুরের মধ্যে যাতায়াতে সবচেয়ে বেশি সময়সাশ্রয়ী মাধ্যম হলো আকাশপথ। বর্তমানে কুয়ালালামপুর-সিঙ্গাপুর সিটির মধ্যকার এয়ার রুটটি হয়ে উঠেছে বিশ্বের ব্যস্ততম আকাশপথ। সড়কপথে বর্তমানে এ দূরত্ব অতিক্রমে সময় লাগে প্রায় ৫ ঘণ্টা। বুলেট ট্রেন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে তা নেমে আসত ৯০ মিনিটে।

কুয়ালালামপুর-সিঙ্গাপুর হাইস্পিড রেলওয়ের ওপর নজর ছিল বিদেশী অনেক প্রতিষ্ঠানেরই। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেই প্যারিসভিত্তিক বহুজাতিক রেল ট্রান্সপোর্টেশন কোম্পানি আলস্টম ও মিউনিখভিত্তিক অটোমেশন জায়ান্ট সিমেন্স মালয়েশিয়ার স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রকল্পটির দরপত্রে অংশ নিতে এক যৌথ কনসোর্টিয়াম গঠন করে। প্রকল্পটির ওপর নজর ছিল জাপানেরও।

প্রকল্পের মোট ব্যয় কত, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পের মোট ব্যয় দেড় হাজার কোটি ডলার। যদিও সাম্প্রতিক নানা তথ্যে অনুমিত হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে এ ব্যয়ের পরিমাণ আরো অনেক বেশি।

মূলত ‘দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার’ ঝুঁকি এড়াতেই প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানান মাহাথির মোহাম্মদ। সাক্ষাত্কারে তিনি আরো জানান, তার পূর্বসূরি নাজিব রাজাকের আমলে মালয়েশিয়ার মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১ লাখ কোটি রিঙ্গিত ছাড়িয়ে যায়। ওই সময় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নে চুক্তি সই হয়েছিল, তার সবই পুনরায় খতিয়ে দেখবেন তিনি।

মাহাথির মোহাম্মদ জানান, এরই মধ্যে চীনা অর্থায়নে মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে নির্মিতব্য এক রেল লিংক প্রকল্প নিয়ে পুনরায় দরকষাকষি করবে তার সরকার। মূলত চুক্তির ‘অসম’ বিষয়গুলো দূর করতেই এ দরকষাকষি করতে চাইছেন তিনি। ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার।

হাইস্পিড রেলওয়ে প্রকল্পটি বাতিলের মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মধ্যকার সম্পর্কে আবারো ফাটল দেখা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে খুব একটা ভাবিত নন মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি জানান, কুয়ালালামপুর ও সিঙ্গাপুরের মধ্যকার বুলেট ট্রেন প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত।

সোমবারের ওই সাক্ষাত্কারে মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, ‘এটি লাভজনক নয়। এর কারণে আমাদের প্রচুর অর্থ ব্যয় হবে। কিন্তু আদতে এখান থেকে আমাদের কোনো আয়ই হবে না।’

তার এ সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কতটা সময় লাগবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নন মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমাদের এ বিষয়ে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি রয়েছে।’

সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো কিছু জানে কিনা জানতে চাইলে মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, ‘আমি জানি না।’ তবে তিনি জানান, প্রকল্প বাতিলের কারণে মালয়েশিয়াকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫০ কোটি রিঙ্গিত (১২ কোটি ৫৭ লাখ ডলার) পরিশোধ করতে হতে পারে। অন্যদিকে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এর নির্মাণ ব্যয় বাবদ মালয়েশিয়াকে পরিশোধ করতে হতো ১১ হাজার কোটি রিঙ্গিত (২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার)।

এদিকে সিঙ্গাপুরের পরিবহন মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট এক সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, দেশটির সরকার এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে মালয়েশিয়ার কাছ থেকে কোনো ধরনের বার্তা পায়নি।

বিষয়টি নিয়ে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মধ্যকার সম্পর্ক খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাহাথিরের প্রত্যাবর্তন-পরবর্তী ঘটনাবলিকে এখন এ কারণেই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন সংশ্লিষ্টরা। ১৯৮১-২০০৩ সাল পর্যন্ত মাহাথির টানা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত তিক্ত। পরে নাজিব রাজাকের আমলে তা বেশ উষ্ণ হয়ে ওঠে।

মূলত দুর্নীতির অভিযোগেই নাজিব রাজাকের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন মালয়েশিয়ার সাধারণ ভোটাররা। এরই প্রতিফলন দেখা গেছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে। অভূতপূর্ব এক বিজয়ের মধ্য দিয়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন নাজিব রাজাকেরই রাজনৈতিক গুরু বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মাহাথির মোহাম্মদ।

নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে ভোটার ও প্রতিপক্ষের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বারহাদের (ওয়ানএমডিবি) অর্থ নয়-ছয়ের। বলা হচ্ছে, তিনি, তার পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও সহযোগীরা মিলে ওই তহবিল থেকে কয়েকশ কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন। হাতিয়ে নেয়া এ অর্থ ব্যবহার করে হাই এন্ড রিয়েল এস্টেট ব্যবসা থেকে শুরু করে শিল্পকর্ম পর্যন্ত নানা জায়গায় বিনিয়োগ করেছেন তারা।

বর্তমানে নাজিব রাজাকের দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকেই ঘুষ গ্রহণ থেকে শুরু করে ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারি পর্যন্ত নানা অভিযোগে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হচ্ছেন তিনি। যদিও তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে চলেছেন নাজিব রাজাক।

ভগ্নদশায় পড়ে যাওয়া মালয়েশিয়ার অর্থনীতিকে মেরামতের পথ খুঁজছেন মাহাথির মোহাম্মদ। তার দাবি, পূর্বতন সরকার বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই আরো খারাপের পথে গিয়েছে।

মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, ‘নাজিব রাজাকের আমলে এমন অনেক বড় বড় প্রকল্প নেয়া হয়েছে বা সরকারি দপ্তর স্থাপন করা হয়েছে, যার আসলে কোনো প্রয়োজনই ছিল না। মূলত তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা বাড়ানোর প্রয়াস হিসেবেই এগুলো গ্রহণ করা হয়েছে, যার জন্য ব্যয় করতে হয়েছে হাজার হাজার কোটি ডলার।’

ভবিষ্যতে ক্ষমতার এ ধরনের অপব্যবহার ও গোটা সিস্টেম একজনের কুক্ষিগত হয়ে পড়ার পথকে রুদ্ধ করতে সংসদীয় ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দিয়েছেন মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘এটা কোনো লুটেরা সরকার হবে না। অবশ্যই এ দেশ আরো অনেক বেশি গণতান্ত্রিক হয়ে উঠবে।

প্রবাসীদের সকল ভিডিও খবর ইউটিউবে দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটি: