শিরোনাম
প্রচ্ছদ / মালয়েশিয়া / মালয়েশিয়ায় এখনো বন্ধ প্রফেশনাল ভিসা, তবুও বাড়ছে দালালদের প্রফেশনাল ভিসার সিন্ডিকেট তৎপরতা!

মালয়েশিয়ায় এখনো বন্ধ প্রফেশনাল ভিসা, তবুও বাড়ছে দালালদের প্রফেশনাল ভিসার সিন্ডিকেট তৎপরতা!

গত বছর প্রথম দিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক সার্কুলারে ঢাকাস্থ মালয়েশিয়ান হাই কমিশন থেকে প্রফেশনাল ভিসা যাচাই-বাছাইয়ের মেইল বার্তা প্রাপ্তি সাপেক্ষে প্রফেশনাল ভিসার ছাড়পত্র দেয়া শুরু হয়। বিএমইটির সহকারী পরিচালক তৈমুর গোফরানকে দায়িত্ব দেয়া হয় মালয়েশিয়ান হাই কমিশন থেকে প্রফেশনাল ভিসার যাচাই-বাছাইয়ের মেইল বার্তা আনার। কিন্ত বিএমইটি’র সহকারী পরিচালক তৈমুর গোফরানের চরম গাফিলতির দরুন মালয়েশিয়ার প্রফেশনাল ভিসার ছাড়পত্র ইস্যুর কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

আর এই সুবাদে একশ্রেণীর প্রভাবশালী মানুষ পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। যে পুরুষের সারাদিন শ্রম দিয়ে দুই শ’ টাকা আয় হয় না, অথবা যে সংসারে মানুষের তিনবেলা তিনমুঠো ভাত জোটে না, কিংবা যে নারী পরিবার ও সমাজে নিদারুণভাবে নিগৃহীত, তাদের যদি বলা হয় এমন এক স্বপ্নের দেশ আছে যেখানে খাদ্যের কোন অভাব নেই এবং দিনে এক শ’ রিঙ্গিত অর্থাৎ বাংলাদেশী টাকায় প্রায় দুই হাজার পাঁচ’শ টাকা রোজগার করা যায় তাহলে সে মানুষের লুঙ্গি পরার সময় কোথায়?

স্বপ্নময় স্বর্ণখনি সন্ধানের অলীক গল্প ফেঁদে সোনালী ভবিষ্যতের মিথ রচনা করে দলে দলে ঝাঁকে ঝাঁকে নিরীহ, নিরপরাধ স্বপ্নবিলাসী বাঙালীকে কখনও সাগরের মতো নৃশংস পথে, কখনও আকাশপথে, কখনও স্থলপথে পাচার করা হচ্ছে। বিনিময়ে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে লাখ লাখ কোটি কোটি টাকা। কারও বাস্তুভিটা বিক্রির টাকা, কারও হালের বলদ ও একমাত্র কৃষি জমি বিক্রির টাকা। এই টাকা সমাজের রাঘববোয়ালদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাবে। এ টাকা দিয়ে তাদের সন্তানরা কেউ ইংরেজী মাধ্যমে পড়বেন, কেউ আবার হিন্দি মাধ্যমে পড়বেন, তারা আর কেউ বাঙালী থাকবেন না। বাঙালী থাকবেন শুধু শোষিত, নিপীড়িত ভুখা-নাঙ্গা খেটে খাওয়া মানুষগুলো। এইতো বাস্তবতা, এইতো নিয়তি!

পাসপোর্ট ও ভিসাবিহীন সমুদ্রপথে পাচার করা হাজার হাজার মানুষ ছাড়াও নানাভাবে মানুষকে ভুল প্রক্রিয়ায় বিদেশ পাঠিয়ে বিপথগামী করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ট্যুরিস্ট ও স্টুডেন্ট ভিসাকে তুরুপের তাস বানানো হচ্ছে। কোনরকম সেভেন-এইট পাস করে ক্ষেতে-খামারে কাজ করতেন এমন অসংখ্য অবুঝ বাঙালীকে এইচএসসি পাসের ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে কন্ট্রাক করে স্টুডেন্ট ভিসায় মালয়েশিয়াতে পাচার করা হচ্ছে। স্টুডেন্ট ভিসায় গিয়ে ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া কাজ করা সম্পূর্ণ অবৈধ। নিচের যে ছবিটিতে যাকে দেখা যাচ্ছে তার নাম মোহাম্মদ ইয়াসিন শেখ সে গত ৬ মাস আগে বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন প্রফেশনাল ভিসায়। কিন্তু ৬মাস পার হয়ে যাওয়ার পরও ভিসা না পাওয়ায় পাগলের ন্যায় ঘুরে বেড়িয়েছে পথে প্রান্তরে শেষমেষ পুলিশের হয়রানি আর ইমিগ্রেশনের অপারেসীর কথা চিন্তা করে গত ১৩ই আগস্ট মালিন্দ এয়ারে ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে যেতে বাধ্য হয়। আমাদের প্রবাসীর দিগন্তের প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ হাসনাত ও নির্বাহী সম্পাদক কাজী আশরাফুল ইসলামের এক সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ ইয়াসিন শেখ বলে আমার মত এরকম আর শত শত বাঙ্গালী কূল কিনারা না পেয়ে অবশেষে দেশে চলে যাচ্ছে। সব কিছু বিক্রি করে এসেছিলাম পরিবারকে ভাল রাখবো বলে কিন্তু স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে্ গেল, এখন কিভাবে পরিবারকে শান্তনা দিবো সেই চিন্তায় করছি। তিনি আরো জানায় মালয়েশিয়ায় আসার পর তার এজেন্ট তার কাছ থেকে পাসপোর্ট নিয়ে যায় স্টিকার লাগাবে বলে কিন্তু দিন যতই বেড়ে চলেছে ঐ এজেন্টে ততোই আড়ালে চলে গেছে ফোনে এজেন্টকে খুঁজে না পেয়ে দেশে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। তাই ট্রাভেল পাস নিয়ে বাংলাদেশে চলে যাচ্ছি। এমন অবৈধ ও প্রতারণার শিকার অসংখ্য বাংলাদেশী আছে যারা মালয়েশিয়ার কাজাং, মেরু, ক্লাং, কাপ্পার, নিলয়, পাহাং, ইপো, বানতিং, জোহর বারু, পেনাং, মালাক্কা, রাওয়াং, আলোস্তা, সাবা সারোয়াকে গিজগিজ করে।

মালয়েশিয়ায় একশ্রেণীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে যারা হাজার হাজার রিঙ্গিতের বিনিময়ে ট্যুরিস্ট ভিসার জন্য আমন্ত্রণপত্রের ব্যবসা করে। এভাবে ট্যুরিস্ট ভিসায় অবৈধ প্রক্রিয়ায় মানবপাচার করা হয়। ট্যুরিস্ট ভিসার শর্ত হলো এক মাস পর অবশ্যই পার্শ্ববর্তী কোন দেশে গিয়ে ফিরে এসে এক মাসের ভিসা নিয়ে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু এই শ্রেণীর ভিসায় যারা যান তাদের অধিকাংশই পরদিন থেকে শ্রমিক হিসেবে কাজে নেমে পড়েন এবং এক মাস পর থেকে সম্পূর্ণ অবৈধ হিসেবে বসবাস করতে থাকেন। পাচারের শিকার এই মানুষগুলোকে কোনক্রমেই জানতে দেয়া হয় না যে, তাদের ট্যুরিস্ট ভিসায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

‘মালয়েশিয়ার পুলিশ বাকিতে ঘুষ খায় এমন একটি সত্য কথা প্রচলিত আছে। ওই দেশে ‘স্পিড মানি হালাল’ এ কারণে সবকিছুকে তারা স্পিড মানি বানিয়ে নেয়। তবে জাতে মাতাল হলেও তালে ঠিক। এ ঘটনা তারা শুধু বাঙালীদের সঙ্গেই ঘটিয়ে থাকে। এভাবে মানবপাচারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো বিমানবন্দর ও ইমিগ্রেশন পুলিশ। মোটা অঙ্কের টাকার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দালালচক্র উভয় দেশের সবকিছু কন্ট্রাক করে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে লাখ লাখ মানুষ পাচার করে।

মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের, ফার্মের বিজনেস ম্যাগনেটদের কাছেও অবৈধ বাঙালীর দারুণ কদর রয়েছে। কারণ মালয়েশিয়ান বা বৈধ কোন বিদেশীকে শ্রমিক হিসেবে পেতে গেলে পারিশ্রমিক অনেক বেশি। যেমন, একজন মালয়কে শ্রমিক হিসেবে নিতে গেলে দিনে আড়াই শ’ থেকে তিন শ’ রিঙ্গিত দিতে হয় এবং বৈধ প্রবাসী শ্রমিককেও কমপক্ষে এক শ’ থেকে দেড় শ’ রিঙ্গিত দিতে হয়। পক্ষান্তরে অবৈধ অসহায় বাঙালী শ্রমিককে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ রিঙ্গিতে খরিদ করা যায়। এরা সব কোটি কোটি রিঙ্গিতের মালিক। অথচ সীমাহীন দরিদ্র অসহায় বাঙালী শ্রমিকের প্রতি এ কোন্ নির্মমতা?

মালয়েশিয়ার পুলিশের অন্যতম ইনকাম সোর্স প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বাঙালী যেহেতু অবৈধ, তাই পথে-ঘাটে, হাটে-মাঠে, নদী-তটে যত্রতত্র ধরে দুইশ’-তিনশ’ রিঙ্গিত ছিনতাই করে। কথা বললেই বেদম প্রহার এবং জেলখানায় পাঠানোর হুমকি অহরহ দিয়ে থাকে। মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন কোম্পানি-ইন্ডাস্ট্রিতে অসংখ্য বাঙালী কর্মরত রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি বাঙালী; কিন্তু সবচেয়ে কম পারিশ্রমিক তাদের। ভারত, নেপাল, পাকিস্তানীদের অবস্থা এমন নয়।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নীতিমালার প্রতি তাদের ন্যূনতম শ্রদ্ধা নেই। মালয়েশিয়ার অর্থনীতির ভিত মজবুত করেছে বাংলাদেশী প্রবাসী শ্রমিক। বাঙালীর বিন্দু বিন্দু ঘামে গড়ে উঠেছে তাদের মুক্তাখচিত অসংখ্য সৌধকিরীটিনী শহর। অথচ এই বাঙালী তাদের গগনচুম্বী অট্টালিকায় যখন সিরিশ ঘষে, তখন অবৈধ হয় না; কিন্তু যখন রাত্রে ঘুমানোর সময় তখন চলে পুলিশী রেড। অসম সাহসী বাঙালী ভিনদেশী হওয়ায় ভয়ে কাতর হয়ে রাত কাটায় পাম বাগানে। যেখানে বিষধর সাপ আর বিকটাকার মশা তাদের নিশিসঙ্গী। হায়রে পৃথিবী! হায়রে জীবন! দিনের বেলায় যারা বৈধ তারা রাতের আঁধারে ঘুমানোর সময় অবৈধ। তবে কি মালয়েশিয়ার প্রশাসন এ ব্যাপারে অবগত নয়? তাই তাদের স্বল্প ব্যয়ে অধিক কর্মদক্ষ বাঙালী শ্রমিক পাওয়ার জন্য এমন নির্মম দ্বৈতনীতি। আমাদের দেশের নৃশংস মানবপাচারকারী আর তথাকথিত সভ্য দেশের ওই সব অসভ্য শাসকের সঙ্গে কিই বা তফাত আছে?

প্রবাসীদের সকল ভিডিও খবর ইউটিউবে দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটি: