শিরোনাম
প্রচ্ছদ / মালয়েশিয়া / মালয়েশিয়ায় প্রতারকদের ফাঁদে অসহায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা !

মালয়েশিয়ায় প্রতারকদের ফাঁদে অসহায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা !

বয়বৃদ্ধ মালয়েশিয়া প্রবাসী সাংবাদিক রফিক আহমেদ। দেশটিতে তার অনেকগুলো বছর কেটেছে। তিনি এখন অসুস্থ। স্কিন ক্যান্সারে আক্রান্ত। সাংবাদিকতা পেশাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন জীবনের শেষ সময়েও। আমরা যখন কাজের ফাঁকে আড্ডায় বসি তখন উনি হঠাৎ করে কথার ফাকেঁ বলে উঠতেন সিটিং-ফিটিং মারিং-কাটিং। আমরা সবাই হাঁসি ঠাট্টা করতাম। দেশটিতে প্রতিনিয়ত প্রতারকদের ফাঁদে পড়ছেন অসহায় বাংলাদেশি প্রবাসীরা।

২০১৬ সালে দেশটিতে কর্মরত অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতার ঘোষণা দেন মালয়েশিয়া সরকার। ধাপে-ধাপে সময় বাড়িয়ে দীর্ঘ আড়াইটি বছর চলে বৈধ করণ প্রক্রিয়া। শেষ হয় চলতি বছরের ৩০ জুন। এই সময়ের মধ্যে জন্ম নিলো অনেক প্রতারকের। ফিট-ফাট অফিস বানিয়ে বৈধ করে দেয়ার নামে খেঁটে খাওয়া অবৈধ কর্মীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে উধাও হয়েছে প্রতারকরা। আবার কেউ-কেউ ফোনে হুমকিও দিচ্ছে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বৈধ হওয়ার জন্য এসব প্রতারকদের হাতে টাকা-পয়সা আর পাসপোর্ট তুলে দিলেও তাদের কপালে জোটেনি বৈধতা।

এসব অবৈধদের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা এখন ইমিগ্রেশন এবং পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ওই প্রতারকরা একজন অবৈধকর্মীকে সিটিং এবং ফিটিং করে তাদের মাধ্যমে বৈধ হওয়ার জন্য। যখন তারা ফাঁদে পড়লো তখনই শুরু করে দিলো মারিং কাটিং।

সাংবাদিক রফিক আহমদের এ উক্তির বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া গেলো শেষ পর্যন্ত। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মালয়েশিয়া সরকার অবৈধ কর্মীদের বৈধ করার জন্য দুটি প্রোগ্রাম চালু রেখেছিল। একটি হচ্ছে রি-হিয়ারিং অন্যটি ই-কার্ড। এ দুটি প্রোগ্রামকে ঘিরে গড়ে ওঠে শক্তিশালী একটি মিডিলম্যান চক্র। বৈধ হওয়া ও মালিকের কাছে কাজ পাওয়া, সব জায়গাতেই এ চক্রকে টাকা দিয়ে টিকে থাকতে হতো কর্মীদের। কর্মীদের বৈধ করে দেয়ার নামে ৫ থেকে ১০ হাজার রিঙ্গিত জনপ্রতি হাতিয়ে নিয়েছে।

সরেজমিনে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি মিডিলম্যানদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা রীতিমতো নিজেদের নামে ভিজিটিং কার্ড ছাপিয়ে প্রকাশ্যে এ ব্যবসা করেছেন। তারা বাংলাদেশি অবৈধ কর্মীর কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন বৈধ করিয়ে দেয়ার জন্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কর্মীদের বৈধ করতে পারেননি। কর্মীদের টাকাও ফেরত দিচ্ছেন না তারা। উল্টো কর্মীদের পুলিশের ভয় দেখানো হচ্ছে। এভাবে এ চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে থাকতে হচ্ছে কর্মীদের।

এছাড়া মালিক তাদের অর্ধেক মজুরিতে কাজ করিয়ে নিচ্ছে। আবার বৈধতার নামে টাকা নিচ্ছে। ফলে হাড়ভাঙা খাঁটুনি খেটে মাস শেষে নিজে খেয়ে পরে বাঁচতেই কষ্ট হচ্ছে অবৈধ কর্মীদের। মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবাসী বলেন, ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি মিডিলম্যান দেশটিতে কর্মী কিনছে আর বিক্রি করছে। তারা যে যেভাবে পারে সেভাবেই কর্মীদের শোষণ করছে। কখনও হাইকমিশনের নামে, কখন পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করে দেয়ার নামে আবার কখনও বৈধ করে দেয়ার নামে।

কোনোভাবেই মুক্তি পাচ্ছে না তাদের হাত থেকে। কর্মীরা বাধ্য হচ্ছে এ চক্রের কথা মতো চলতে। বৈধ হওয়ার আবেদন করতে কোনো কর্মীকে ১২ শ’ রিংগিত জমা দেয়া লাগলেও অনেকেই মিডিলম্যানদের বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে বৈধ হওয়ার জন্য নিশ্চিত মনে বসে আছে।
এরা আর কেউ নন, বাংলাদেশেরই মানুষ। তারাও একদিন কর্মী হিসেবেই মালয়েশিয়ায় এসেছেন। দীর্ঘদিন দেশটিতে বসবাস করে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। এমনকি তাদের পুলিশের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

মালয়েশিয়ার কেলাংয়ের কাপার বাতু লিমার মিনহু ফ্যাক্টরি এলাকায় থাকেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের ইব্রাহিম মানিক। ২০০৮ সালের প্রথমদিকে কলিং ভিসায় মালয়েশিয়ায় আসেন তিনি। ভিসার মেয়াদ শেষে বর্তমানে তিনি অবৈধভাবে সেখানে বসবাস করছেন। ইব্রাহিম মানিক বৈধতা নিতে ভিসার জন্য পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে যোগাযোগ করেন টাঙ্গাইলের মাসুদের সঙ্গে। মাসুদও মালয়েশিয়ায় একই এলাকায় থাকেন দীর্ঘদিন ধরে।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ইব্রাহিম মানিক জানান, ভিসা করে দেয়ার জন্য মাসুদ দুই দফায় ১০ হাজার রিংগিত (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দুই লাখ টাকা) তার কাছ থেকে নিয়েছেন। প্রথমবার মাসুদ ২০১৫ সালে অক্টোবর মাসে ৫ হাজার রিংগিত নেয় এবং ২০১৬ সালে দ্বিতীয় দফায় আরও ৫ হাজার রিংগিত নেন তিনি।

ইব্রাহিম মানিকের অভিযোগ এতগুলো টাকা নিয়েও মাসুদ তাকে ভিসা করে দেয়নি। প্রথম দফায় পাসপোর্টে একটি ভিসা লাগিয়ে দেয়। অনলাইনে চেক করতে গেলে তা ভুয়া বলে জানা যায়। পরের বার মানিকের ছবির পরিবর্তে তার পাসপোর্টে অন্যের ছবিযুক্ত ভুয়া ভিসা লাগিয়ে দেয়। এর কৈফিয়ত এবং টাকা চাইতে গেলে উল্টো মানিককে জীবননাশের হুমকি দেন মাসুদ।

মানিক বলেন, বর্তমানে তিনি একটি গ্লাস কোম্পানিতে কাজ করেন। অবৈধ হওয়ায় সচরাচর বাইরে বের হতে পারেন না। কাজ শেষে রুমেই বেশি থাকেন।

সরেজমিনে কেলাংয়ের কাপার বাতু লিমার মিনহু ফ্যাক্টরি এলাকায় প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাসুদ এক সময় কর্মী হিসেবে মালয়েশিয়ায় গেলেও বর্তমানে তিনি আর কোনো জায়গায় কাজ করেন না। ইব্রাহিম মানিকের মতো অনেক বাংলাদেশি শ্রমিকের কাছ থেকেই ভিসা করে দেয়ার কথা বলে টাকা নিয়েছেন মাসুদ। ওই এলাকায় ইন্ডিয়ানদের সমন্বয়ে তার একটি গ্যাং স্টার রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বেশ কয়েজন প্রবাসী বাংলাদেশি।

প্রবাসী কর্মীদের সঙ্গে নানাভাবে প্রতারণা করাই ওই গ্যাং স্টার গ্রুপের কাজ। এছাড়া সেখানে অবৈধ হুন্ডি ব্যবসাও রয়েছে তাদের। প্রবাসী কর্মীরা এদের দ্বারা নানাভাবে নির্যাতিত হলেও ভয়ে মুখ খুলেন না।

এদিকে মালয়েশিয়া সরকার ১ জুলাই থেকে শুরু করে মেগা-থ্রি নামে অভিযান শুরু করে। আর এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যেখানেই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে সেখানেই আটক হচ্ছেন অবৈধরা। আটকের পর অবৈধদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এবং তাদের অভিযোগের ভিওিতে বাংলাদেশি, পাকিস্তান, ইন্ডিয়া ও মালয়েশিয়ান প্রায় ১শ জন প্রতারক এজেন্টদের তালিকা তৈরি করেছে অভিবাসন বিভাগ। মেগা-থ্রি অভিযানের পাশাপাশি এ সব প্রতারকদের আটকে গোপনে কাজ করছে দেশটির স্পেশাল বিভাগ।

এমনকি মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত দালাল থেকে শুরু করে পুরো সিন্ডিকেটকে ধরতে মাঠে নেমেছে ইমিগ্রেশন বিভাগ। ১০ জুলাই বাংলাদেশি দালাল চক্রের একটি অফিস থেকে ৬৬ জনকে উদ্ধার করেছে ইমিগ্রেশনের স্পেশাল ব্রাঞ্চ। তবে অফিসটিতে কর্মরত ১১ জন বাংলাদেশি ও দুইজন মালয়েশিয়ান নাগরিকও আটক হন।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২৫ সদস্যর একটি স্পেশাল বাহিনী কুয়ালালামপুরের পার্শ্ববর্তী সিরি সেরডাং এলাকায় অভিযান চালায়। যদিও রি-হিয়ারিং প্রোগ্রামের আওতায় লাইসেন্স পেয়েছিল ওই বাংলাদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিটি।

শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে ৯৮টি পাসপোর্টের ফটোকপি ২ লাখ ৫০ হাজার মালায় রিংগিত উদ্ধার করা হয়। এছাড়া অপর একটি রুম থেকে ৫৫ জন বাংলাদেশি ও দুইজন ইন্ডিয়ার নাগরিককে আটক করা হয়। ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক সেরি মোস্তাফার আলী জানান, দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়াকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে অবৈধ শ্রমিক আমদানি করে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন কলকারখানায় সাপ্লাই করতো সিন্ডিকেট গ্রুপটি।

তিনি জানান, বিভিন্ন দেশ থেকে অবৈধভাবে শ্রমিক এনে ওই রোম ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে মালয়েশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাপ্লাই করতো। আটকদের বিরুদ্ধে অভিবাসন আইন ১৯৫৯/৬৩, ১৯৬৬, ১৬৩ গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তিনি বলেছেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে পুলিশ এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি এটা নিশ্চিত করার জন্য যে, মূল প্রবেশ পথগুলো আর যেন কেউ অবৈধভাবে ঢুকতে না পারে।

এদিকে গত তিন বছরে বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধে মোট ২৩ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে মালয়েশিয়া থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় কাজ করছে। দেশটিতে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ ইন্দোনেশিয়ার, ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ নেপালের, ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ বাংলাদেশের, ৬ দশমিক ৯ শতাংশ, মিয়ানমারের, ৫ দশমিক ১ শতাংশ ভারতের, ৩ দশমিক ১ শতাংশ ফিলিপাইনের, ২ দশমিক ৫ শতাংশ পাকিস্তানের, শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ থাইল্যান্ডের এবং ৪ দশমিক অন্যান্য দেশের।

প্রবাসীদের সকল ভিডিও খবর ইউটিউবে দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটি: