শিরোনাম
প্রচ্ছদ / লিবিয়া / লিবিয়ার ডিটেনশন সেন্টারে ৩৭ বাংলাদেশির মানবেতর জীবন।

লিবিয়ার ডিটেনশন সেন্টারে ৩৭ বাংলাদেশির মানবেতর জীবন।

তারা ৩৭ জন। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। কয়েক মাস আগে পাড়ি দিয়েছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ায়। লক্ষ্য ছিল- ইউরোপের দেশ ইতালি। এমন প্রলোভনই তাদেরকে দেখিয়েছিল দালালেরা। বলেছিল- ইতালি পৌঁছানোর পরই টাকা হাতে নেবে। সরল বিশ্বাসে এসব কথা বিশ্বাস করে তারা। কিন্তু দেশ ছাড়ার পরই পাল্টে যায় দালালদের চরিত্র।

বন্দিশালায় আটকে ফেলে তাদের। পরিবারের কাছে দাবি করে মোটা অঙ্কের টাকা। সেই টাকা পাওয়ার পরই নৌকায় তুলে ভূ-মধ্যসাগরে ছেড়ে দেয়। কিন্তু ইতালি পৌঁছানোর আগেই অনেকের সঙ্গে লিবিয়ান কোস্টগার্ডের হাতে ধরা পড়ে এই ৩৭ বাংলাদেশি। এরপর থেকেই রয়েছেন ডিটেনশন সেন্টারে। গত সাড়ে তিন মাসে একবারও শেডের বাইরে আসতে দেয়া হয়নি ভাগ্যবিড়ম্বিত এই বাংলাদেশিদের। দেখতে পাননি সূর্যের আলো। অনেকের গায়ে কোনো কাপড় নেই। নিত্য খাবারের স্বল্পতা। যা দেয়া হয় তাও অত্যন্ত নিম্নমানের।

তার ওপর কর্তৃপক্ষের অহেতুক মারধর। গত ৭ই নভেম্বর ওই ডিটেনশন সেন্টার পরিদর্শন শেষে এই চিত্র পেয়েছেন লিবিয়ার ত্রিপোলিস্থ বাংলাদেশি কর্মকর্তারা। দূতাবাস কর্মকর্তারা জানান, এ সময় প্রতিনিধি দলের কাছে উন্নত খাবার এবং কাপড়ের জন্য আকুতি জানান। কর্মকর্তারা এই ৩৭ বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলে ঢাকার কয়েকটি এজেন্সি এবং দালালচক্রের বেশ কয়েকজনের নাম-পরিচয়ও পেয়েছেন। এ ব্যাপারে গত ৯ই নভেম্বর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে দূতাবাস একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতারিত ওই ৩৭ বাংলাদেশি হলেন- মাদারীপুরের মো. মসিউর হাওলাদার, মো. মুসা মীর, মো. রুবেল মুন্সি, সুরুজ, রাজিব মাতব্বর, আলমগীর শেখ, জমির আলী, মো. ইলিয়াস মাতব্বর, বাবু খলিফা, আসাদুল ইসলাম, রুহুল আমিন খান, মো. সোহান খান, মো. জাহিদুল ফকির, মো. শিপন ফকির, নাসের ফকির, মো. হৃদয় মাতব্বর, মো. আহমেদ আলী, জাহিদুল হাওলাদার, দিলীপ হাওলাদার, রনি মুন্সি, মাহবুব খালাশি, রবিউল ব্যাপারী, মুন্সীগঞ্জের রেজাউল করিম, গোপালগঞ্জের মো. শেখ রনি, মো. মাহবুল শেখ, মো. বাচ্চু মিয়া, কামরুজ্জামন, কাজী জাকারিয়া, ফরিদপুরের নাজমুল, শরিয়তপুরের মতিউর রহমান, কুষ্টিয়ার মো. রবিউল ইসলাম, বরিশালের মোহাম্মদ আলী, বগুড়ার মো. করিম মণ্ডল, মানিকগঞ্জের মোহাম্মদ আলম এবং খুলনার মো. রাসেল মাতব্বর।

দূতাবাস সূত্র জানায়, ৩৭ বাংলাদেশিসহ প্রায় তিন শতাধিক মানুষ গত ১লা সেপ্টেম্বর নৌকায় করে লিবিয়া থেকে ভূ-মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালি যাচ্ছিলেন। এ সময় লিবিয়ান কোস্টগার্ডের হাতে আটক হন। গত ২রা নভেম্বর লিবিয়ার অবৈধ অভিবাসন সংস্থা বাংলাদেশ দূতাবাসকে এই তথ্য জানায়। তথ্যের ভিত্তিতে সংস্থাটির মহাপরিচালক ওসামা আল তান্তুসি ও পরিচালক কর্নেল মোস্তফা আল ইদ্রিসের সঙ্গে গত ৫ই নভেম্বর দূতাবাসের কাউন্সিলর ও আইন সহকারি একটি বৈঠক করেন। আটক বাংলাদেশিদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের আবেদন করেন দূতাবাস কর্মকর্তারা। কিন্তু তারা লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি হতে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে গারিয়ান শহরের উপকূলে ‘আল-হামরা’ নামক ডিটেনশন সেন্টারে থাকায় নিরাপত্তাহীনতার কারণে অবৈধ অভিবাসন সংস্থা পুলিশ প্রহরায় সেখানে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। পরে তাদের অনুমতির প্রেক্ষিতে গত ৭ই নভেম্বর পুলিশ প্রহরায় দূতাবাস কর্মকর্তারা ওই ডিটেনশন সেন্টার পরিদর্শনে যান। আটক বাংলাদেশিদের বরাত দিয়ে দূতাবাস সূত্র জানায়, তাদের অধিকাংশই দালালদের ৫-৭ লাখ টাকা দিয়ে লিবিয়ায় প্রবেশ করেন। এজন্য তারা চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহার করেন এবং ট্রানজিট হিসেবে দুবাই-ইস্তাম্বুুল-আম্মান-কায়রো বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। লিবিয়ায় প্রবেশের পর বাংলাদেশি দালালরা সেদেশের সহযোগীদের মাধ্যমে বিমানবন্দরে গ্রহণ করে। পরে তাদেরকে দালালদের বাসস্থানে আটকে রাখে।

সেখানে অবস্থানকালে অনেকেই চুক্তিবহির্ভূত অতিরিক্ত এবং ভরণপোষণ ও আবাসনের জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদান করেন। এই অর্থ তারা আটক থাকা কর্মীদের পরিবারের কাছ থেকে নিজস্ব ব্যাংক ও বিকাশ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে গ্রহণ করে। পরে তারা জানতে পারেন, যেসব কোম্পানিতে তাদের কাজ দেয়ার কথা বলে সেখানে নেয়া হয়েছে বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। ফলে তারা লিবিয়ায় কোনো কাজ পাননি। কিছুদিন পরই ওই দালালচক্র তাদের ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখায়। এই বাবদ তারা আরো টাকা আদায় করে। পরে তাদেরকে লিবিয়ান ও বাংলাদেশিদের সমন্বয়ে গঠিত ইতালি পাঠানোর একটি চক্রের হাতে সোপর্দ করে। ওই চক্র তাদেরকে ১৫দিন দেশটির সাবরাতা এবং সর্বশেষ ৭ দিন জোয়ারা শহরের একটি গোপন আস্তানায় আটকে রাখে। অবশেষে গত ১লা সেপ্টেম্বর একটি ছোট নৌকায় তুলে দেয়। মধ্যরাতে যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরেই লিবিয়ান কোস্টগার্ডের টহল জাহাজ নৌকাটি লক্ষ করে গুলি ছুড়লে এর ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। পরে নৌকাটি টেনে লিবিয়ান উপকূলে এনে উদ্ধারকৃতদের গারিয়ান ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি রাখা হয়। দূতাবাস কর্মকর্তারা জানান, পরিদর্শনকালে আটক বাংলাদেশিরা তাদের নানা ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, কম ও নিম্নমানের খাবার ছাড়াও তাদেরকে কর্তৃপক্ষ মাঝেমধ্যেই মারধর করে। গত কয়েকমাস ধরে শেডের বাইরে যেতে না দেয়ায় তারা সূর্য দেখতে পাননি। অনেককে পরনে ও গায়ে কোনো কাপড় না থাকা অবস্থায় পাওয়া যায়। তারা সকলেই উন্নত খাবার এবং কাপড়ের জন্য আকুতি জানান। প্রতারিত এই বাংলাদেশিদের অধিকাংশই জানান, তারা ঢাকার ফকিরাপুল এলাকার স্কাই ট্যুর এজেন্সির শাহীন বাবু, রহিম ট্রাভেল এজেন্সির মুন্না এবং একই এলাকার আরেকটি এজেন্সির প্রতিনিধি হারুন রাজার মাধ্যমে লিবিয়া যান। তারা আরো জানান, স্কাই ট্যুর এজেন্সির পক্ষে লিবিয়ায় কাজ করছে নোয়াখালীর সুজন ও তার চাচাতো ভাই মাহবুব। তারাই শাহীন বাবুর পাঠানো কর্মীদের লিবিয়ায় দেখাশুনা করে। আটককৃতদের মধ্যে আহমেদ, জাহিদুল মাহবুব ও মতিউর এই এজেন্সির মাধ্যমে লিবিয়ায় প্রবেশ করেন। পরে সুজনের তাজুরস্থ ক্যাম্পে নিয়ে তাদেরকে নির্মম নির্যাতন করা হয়। রহিম ট্রাভেল এজেন্সির পক্ষে কাজ করে লোকমান। তাদের হয়ে বাংলাদেশে অর্থ সংগ্রহ করে মাদারীপুরের ইসমাইল, মুসা মীর ও রুহুল আমিন এই এজেন্সির মাধ্যমে লিবিয়ায় গেছে। সর্বশেষ গ্রুপের পক্ষে কাজ করছে মাদারীপুরের আশরাফ ও সোহাগ। এদের পক্ষে অর্থ সংগ্রহ করে হারুন রাজা। আটক সোহাগ খান, শিপন ফকির ও নাসির ফকির এই গ্রুপের মাধ্যমে দেশটিতে যান।

এছাড়া প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের আরো যাদের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে তারা হলো- গোপালগঞ্জের মকছেদপুরের বড়ইতলার শুক্কুর আলী, ওসমান, চরপ্রসন নদীর খলিল, মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার তাতিকান্দি গ্রামের সবুর আলীর ছেলে মিলন আলী, কবিরাজপুর গ্রামের বদর উদ্দিনের ছেলে সালাহ উদ্দিন, টেকেরহাট এলাকার পূর্বশর মঙ্গল গ্রামের জহির, শিবচর উপজেলার লাভলু প্রমুখ। মন্ত্রণালয়ে পাঠানো দূতাবাসের চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, এই ৩৭ বাংলাদেশিকে তারা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছেন এবং লিবিয়ায় অবস্থানকারী বাংলাদেশি অপরাধীদেরকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে অবস্থানকারী মানবপাচারকারী চক্রকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও অনুরোধ জানিয়েছে দূতাবাস। এদিকে লিবিয়ার ডিটেনশন সেন্টারে আটক কয়েকজন বাংলাদেশির পরিবারে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই লিবিয়ায় উচ্চ বেতনে কাজ দেয়ার কথা বলে নিয়ে গেছে। আবার অনেকের ইতালি নিয়ে যাওয়া বলেই নিয়ে গেছে। শুরুতে তাদের অধিকাংশের কাছ থেকে নামমাত্র টাকা নেয়া হয়। পরে লিবিয়ায় যাওয়ার পর আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। অনেকে উচ্চ সুদে এবং জায়গাজমি বিক্রি করে ওই টাকা জোগাড় করেছেন। ওইসব পরিবার তাদের স্বজনদের ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের প্রতি আকুতি জানিয়েছেন

প্রবাসীদের সকল ভিডিও খবর ইউটিউবে দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটি: