শিরোনাম
প্রচ্ছদ / ওমান / সাধারণ ক্ষমার সুযোগ চায় ওমানে কর্মরত পলাতক শ্রমিকেরা।

সাধারণ ক্ষমার সুযোগ চায় ওমানে কর্মরত পলাতক শ্রমিকেরা।

মুজিব নামের এক বাংলাদেশী পলাতক শ্রমিক, প্রতিদিন সকাল ৫টায় ওমানের রাজধানী মাস্কটের মুতরাহ প্রদেশের হামরিয়াহ এলাকায় আরো অনেক পলাতক শ্রমিকের সাথে কাজের জন্য লাইনে দাঁড়ায়। উদ্দেশ্য, তার নিজের জন্য এবং দেশে পরিবারের সদস্যদের জন্য খাবারের অর্থ যোগাড় করা। মুজিব তার কাজ থেকে পালিয়েছে একটু বেশি অর্থ উপার্জনের জন্য। সে তার বৈধ নিয়োগদাতার অধীনে কাজ করে যা উপার্জন করতো, এখন অবৈধ হয়ে কখনো কখনো তার দিনগুণ অর্থ উপার্জন করে। মুজিব বলছেন-‘আমি ভেবেছিলাম কাজ থেকে পালিয়ে আমি আমার অন্য সহকর্মীদের মতো খুব অল্প সময়েই অনেক অর্থ উপার্জন করতে পারবো।’

প্রথম কিছুদিন মুজিব মাসে ২৫০ রিয়াল পর্যন্তও উপার্জন করেন। আবার কখনো কখনো মাসে তার উপার্জন ৫০ রিয়ালেও নেমে আসে। সে মাসে কত উপার্জন করবে তা কাজের সুযোগের উপর নির্ভর করে। কারণ ওমানে প্রতিদিন মুজিবের মতো হাজার হাজার বাংলাদেশী, ভারতিয় এবং পাকিস্তানী পলাতক শ্রমিক কাজর সন্ধানে নামে।‘এভাবে টিকে থাকাটা আমার জন্য কষ্টকর। বৈধ নিয়োগদাতার কাছ থেকে পালিয়ে আসাটা আমার জন্য ভুল হয়েছে। আমি এখন অবৈধ। আমি এটা করেছিলাম দেশে আমার পরিবারের স্বচ্ছলতার জন্য। কারণ, পরিবারে আমিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।’

ওমানের আইন অনুযায়ী, কোন প্রবাসী শ্রমিককে অবশ্যই তার স্পন্সরের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হবে এবং অবশ্যই শুধু তার জন্য কাজ করতে হবে। চাকরি পরিবর্তন করতে হলে তাকে অবশ্যই স্পন্সরের অনুমতি নিয়েই করতে হবে। ওমানের জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০১৫ সালে ৬০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক তাদের কাজ থেকে পালিয়েছে। দেশটিতে নিবন্ধিত ১৯ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের মধ্যে এই পালানোর হার ১.৩%। এই পলাতক শ্রমিকদের মধ্যে কয়েক হাজার জন আবার গ্রেফতার হয়েছে রয়্যাল ওমান পুলিশ এবং জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের যৌথ অভিযানে।

পলাতক শ্রমিকদের বেশিরভাগই নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে প্রতিদিন ৮ রিয়ালের বিনিময়ে কাজ করে। ইকবাল নামে একজন পাকিস্তানী শ্রমিক বললেন, এটা তাদের জন্য অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ যে কোন সময় তাদের ধরতে অভিযান চালানো হতে পারে। মুজিব এবং ইকবাল দুই বছর আগে তাদের কাজ থেকে পালায়। আগে তারা উটের রাখাল হিসেবে কাজ করতো। বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তাদের বক্তব্য হলো-‘গত ৪ মাসে কাজের সুযোগ একেবারে কমে গেছে। আমাদের ৬ ঘন্টা পর্যন্ত রাস্তায় বসে থাকতে হয় এই আশায় যে, যদি কেউ আমাদের কাজে নেয়।’

ইকবাল পাকিস্তানী এক দালালকে ১৩০০ রিয়াল দিয়ে ওমানে এসেছে। আর সেই টাকা যোগাড় করতে তার বাবার জমি বিক্রি করতে হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সে ওমানে অবৈধ শ্রমিক হয়ে গেছে।

অনেক প্রবাসী শ্রমিক- বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শ্রমিকরা আসে তার নিজের দেশে রিক্রুটিং এজেন্সীকে বিপুল পরিমাণ অর্থ। এমনও হয় যে, সেই অর্থের পরিমাণ তার এক বছরের মজুরীর সমান হয়ে যায়। তারপর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এসে তারা চাকরি পেতে এবং দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। অনেকেই আবার ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে।

অনেক পলাতক বিদেশী শ্রমিক তাদের অনিশ্চয়তার জীবন থেকে মুক্তি পেতে এবং নিজ দেশে ফেরত যেতে, ওমান সরকারের কাছে ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেছেন। তারা বলছেন, ওমান থেকে বের হওয়ার অনেক চেষ্টা করেছেন তারা। কিন্তু কোন পথ খুঁজে পাননি।  বাংলাদেশী শ্রমিক মুজিব বলছেন-‘এটা আমরা আর সহ্য করতে পারছি না। আমরা জানি এটা আমাদের ভুল। কিন্তু আমরা আশা করি ওমান সরকার অবৈধ শ্রমিকদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করবে যাতে করে আমরা এই দেশ ছেড়ে যেতে পারি।’

ওমানের আইন অনুযায়ী, কোন প্রবাসী শ্রমিক যদি ভিসার মেয়াদের অতিরিক্ত সময় ওমানে থাকে তাহলে তাকে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে ভিসা চার্জ হিসেবে ২০ রিয়াল প্রদান করতে হবে এবং অতিরিক্ত থাকা প্রত্যেক মাসের জন্য ১৯ রিয়াল করে দিতে হবে জনশক্তি মন্ত্রণালয়কে। আর যদি কোন প্রবাসী শ্রমিকের বিরুদ্ধে তার কর্মস্থল থেকে পালানোর অভিযোগ থাকে তাহলে তাকে ৪০০ রিয়াল জরিমানা দিতে হবে।

২০১৫ সালে ১৯ হাজারেরও বেশি অবৈধ প্রবাসী শ্রমিক ওমান ত্যাগ করতে সাধারণ ক্ষমার জন্য আবেদন করেছিলেন। তাদের অনেককেই নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। আবারো নতুন কোন সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা আসছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানালেন, এখন পর্যন্ত এমন কোন পরিকল্পনা নেই। আইন অনুযায়ী, সাধারণ ক্ষমার যোগ্য শুধু তারাই যারা তাদের কাজ থেকে পালিয়েছেন বা ভিসার মেয়াদের অতিরিক্ত সময় অবস্থান করেছেন। যারা অবৈধভাবে ওমানে প্রবেশ করেছে তারা এ সুবিধা পান না। ২০১০ সালে প্রায় ১০ হাজার মানুষ সাধারণ ক্ষমার জন্য আবেদন করেন। ওমানে বর্তমানে ৪০ হাজার বাংলাদেশী, ৪ হাজার পাকিস্তানী এবং ৩ হাজার ভারতীয় শ্রমিক আছে যাদের বৈধ কোন কাগজপত্র নেই।

বাংলাদেশী শ্রমিক মুজিব ২০১৫ সালে সাধারণ ক্ষমার জন্য আবেদন করেননি। কারণ পরিবারের কাছে টাকা পাঠানো এবং ঋণ শোধ করার জন্য অবৈধভাবেই কাজ করার পরিকল্পনা ছিল তার। এখন যদি ওমান সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে তবে তিনি প্রথম সুযোগেই তার জন্য আবেদন করতে চান।

প্রবাসীদের সকল ভিডিও খবর ইউটিউবে দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটি: